শুধু ব্যায়াম নয়, হারানো শৈশবকে ফিরে পাওয়ার চাবিকাঠি
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মালাসন (Malasana): যোগাসনের রাজ্যে হারানো সেই শৈশবের স্কোয়াটিং-এর গল্প
ছোটবেলায় মনে পড়ে? দাদা-দিদিদের সঙ্গে কানামাছি খেলতে খেলতে একদম মাটিতে উবু হয়ে বসে পড়তাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত, কিন্তু পায়ে একটুও ব্যথা করত না। আর এখন? পাঁচ মিনিট স্কোয়াট করলেই হাঁটু-পিঠে যেন আগুন জ্বলে। দোষটা কার? আমাদের আধুনিক লাইফস্টাইলের, বিশেষ করে সেই "ওয়েস্টার্ন টয়লেট" আর চেয়ারে বসে অফিস করার অভ্যাসের ।
যোগব্যায়ামের এক আশ্চর্য আসন আছে—মালাসন (Malasana) বা গার্ল্যান্ড পোজ (Garland Pose)। সংস্কৃত শব্দ "মালা" থেকে এর উৎপত্তি, মানে মালা বা গলার হার । এই আসনে বসলে শরীরটা অনেকটা মালার মতো গোল হয়ে আসে, তাই এমন নাম। পশ্চিমা বিশ্বে একে অনেক সময় যোগ স্কোয়াট (Yoga Squat) বা উপবেশনাসন (Upaveshasana) নামেও ডাকা হয় । এটা শুধু একটি আসন নয়, এটা আমাদের শরীরের সেই ন্যাচারাল মুভমেন্টকে ফিরে পাওয়ার চাবিকাঠি, যা আমরা সভ্যতার নামে হারিয়ে ফেলেছি।
আজ আমরা মালাসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব—কীভাবে করতে হবে, কী কী উপকার পাবেন, কাদের করা উচিত নয়, এবং কীভাবে একে আপনার ডেইলি রুটিনের অংশ বানাবেন। বিশেষ করে যাঁরা ইউএস-এ থাকেন, দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই আসনটি কিন্তু ম্যাজিকের চেয়ে কম কিছু না!
১. মালাসন কী? (What is Malasana?)
আসলে মালাসন হল গভীর একটি স্কোয়াটিং পোজ। আপনি যখন মাটিতে এমনভাবে বসবেন যে আপনার হিল মাটিতে লেগে থাকবে, হাঁটু দুটো বাইরের দিকে খোলা থাকবে, আর মেরুদণ্ড সোজা রেখে হাত দুটো বুকের সামনে প্রার্থনার ভঙ্গিতে (অঞ্জলি মুদ্রা/Anjali Mudra) জোড়া থাকবে—ঠিক তখনই আপনি মালাসনে আছেন ।
মজার ব্যাপার হল, শিশুরা যখন মাটিতে খেলে, তখন তারা ঠিক এই অবস্থানেই বসে। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার, সোফা, আর গাড়িতে বসার অভ্যাস আমাদের শরীরের এই স্বাভাবিক নমনীয়তা কেড়ে নেয় । মালাসন আমাদের আবার সেই হারানো ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়।
২. মালাসনের নামকরণ ও ইতিহাস (Etymology & History)
যোগগুরু বি.কে.এস. আইয়েঙ্গারের মতে, এই আসনের নাম "মালাসন" রাখা হয়েছে কারণ এতে হাত দুটো গলায় মালার মতো ঝুলে থাকে । আবার অন্য মতে, এটি "গোল্ডেন বেল্ট পোজ" নামেও পরিচিত, যখন হাত পেছনে বেঁধে রাখা হয় ।
১৯ শতকের শ্রীতত্ত্বনিধি গ্রন্থে মালাসন নামে যে ছবি আছে, সেটা এখন যা ভুজপীড়াসন (Bhujapidasana) নামে পরিচিত—সেখানে শরীর পুরোপুরি হাতের ওপর ভর দিয়ে থাকে । তবে আধুনিক যোগচর্চায় আমরা সাধারণত যে স্কোয়াটিং পোজটি করি, সেটাকেই মালাসন বলে থাকি ।
একটি মজার গল্প: একজন যোগ শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের বলেছিলেন, "তোমরা জানো আমাদের পিঠ নষ্ট করার জন্য কে দায়ী? ওয়েস্টার্ন টয়লেট!" গ্রামের দিদিমারা যে কাজ করতেন—রান্না, কাপড় কাচা, মোপ দেওয়া—সবই উবু হয়ে বসে। তাঁদের আলাদা করে জিমে যেতে হতো না, কারণ লাইফস্টাইলই ছিল ওয়ার্কআউট ।
৩. মালাসন করার সঠিক পদ্ধতি (Step-by-Step Guide)মালাসন করতে প্রথমে শরীর একটু ওয়ার্ম আপ করে নেওয়া ভালো। বিশেষ করে হিপ ওপেনার যেমন বদ্ধকোনাসন বা হ্যাপি বেবি পোজ করে নিতে পারেন । এবার ধাপে ধাপে জেনে নিই কীভাবে করবেন:
যা করবেন:
শুরুতে সোজা হয়ে দাঁড়ান: পা দুটো সামান্য আলাদা রাখুন, নিতম্বের সমান দূরত্বে। পায়ের আঙুলগুলো একটু বাইরের দিকে ঘুরিয়ে রাখুন ।
ধীরে ধীরে নিচে নামুন: হাঁটু ভাঁজ করে ধীরে ধীরে পোঁদ নিচে নামান, যেন উবু হয়ে বসছেন। মনে রাখবেন, হাঁটু যেন পায়ের আঙুলের ওপর দিয়ে বেরিয়ে না যায় ।
হাতের অবস্থান: হাত দুটো বুকের সামনে প্রার্থনার ভঙ্গিতে নিয়ে আসুন। কনুই দিয়ে হাঁটু দুটোকে আলতো করে বাইরের দিকে ঠেলে দিন, যাতে কুঁচকির অংশ খুলে যায় ।
মেরুদণ্ড সোজা রাখুন: পিঠ সোজা রাখুন, বুক খোলা রাখুন। কাঁধ Relaxed রাখুন, কানের দিকে ওঠাবে না ।
হিল মাটিতে লাগিয়ে রাখুন: এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হিল মাটিতে না লাগলে আসনের পুরো উপকার পাওয়া যায় না। যদি হিল না লাগে, গোড়ালির নিচে রোল্ড ম্যাট বা কম্বল দিয়ে সাপোর্ট দিন ।
শ্বাস-প্রশ্বাস: এই অবস্থায় ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট থাকুন, ধীরে ধীরে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন । প্রতিদিন ৩-৫ বার করতে পারেন ।
যা করবেন না:
৪. মালাসনের অসাধারণ সব উপকারিতা (Benefits of Malasana)
এই একটি মাত্র আসন আপনার শরীরে কত রকম পরিবর্তন আনতে পারে, তা জেনে আপনি অবাক হবেন!
শারীরিক উপকারিতা (Physical Benefits):
হিপ ওপেনার: সারাদিন চেয়ারে বসে টাইট হয়ে যাওয়া হিপস ও গ্রয়েন এলাকাকে স্ট্রেচ করে এবং নমনীয়তা ফিরিয়ে আনে ।
হজমশক্তি বাড়ায়: পেটের অংশ সংকুচিত হয়ে আবার খুলে যায়, এতে পেটের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো ম্যাসাজ হয় এবং হজমশক্তি বাড়ে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় ।
গোড়ালি ও হাঁটুর জোর বাড়ায়: গোড়ালির জয়েন্টের নমনীয়তা বাড়ায় এবং হাঁটু শক্তিশালী করে ।
পিঠের ব্যথা কমায়: পিঠের নিচের দিকের পেশি মজবুত করে এবং মেরুদণ্ড লম্বা করে, ফলে পিঠের ব্যথা কমে ।
পেলভিক ফ্লোর মজবুত করে: মহিলাদের জন্য বিশেষ উপকারী, পেলভিক এলাকা শক্তিশালী করে এবং মূত্রথলির সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে ।
পিরিয়ডের সমস্যা কমায়: অনিয়মিত মাসিক ও পিরিয়ডের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে ।
গর্ভাবস্থায় উপকারী: নরমাল ডেলিভারির জন্য পেলভিক এরিয়া প্রস্তুত করে, তবে প্রথম ও দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে এড়িয়ে চলা ভালো, তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে করা যায় ।
শরীর ডিটক্স করে: মালাসনে বসে গরম জল খাওয়ার অভ্যাস শরীর ভেতর থেকে পরিষ্কার রাখে এবং কিডনির সমস্যা দূর করে ।
মানসিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা (Mental & Spiritual Benefits):
গ্রাউন্ডিং: মাটির এত কাছে থাকার কারণে মন শান্ত হয় এবং সেন্টারেড ফিল হয় ।
ফোকাস বাড়ায়: ব্যালান্স ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে ।
মূলাধার চক্র ও স্বাধিষ্ঠান চক্রের ভারসাম্য: মালাসন মূলাধার চক্রকে (Root Chakra) গ্রাউন্ড করে এবং স্বাধিষ্ঠান চক্রকে (Sacral Chakra) অ্যাক্টিভেট করে। স্বাধিষ্ঠান চক্র হলো সৃজনশীলতা, আবেগ ও যৌনশক্তির কেন্দ্র। এই আসন নিয়মিত করলে সৃজনশীলতা বাড়ে এবং মানসিক স্থিতিশীলতা আসে ।
আয়ুর্বেদিক দৃষ্টিকোণ: এটি অপান বায়ু ও পাচক পিত্ত-কে ভারসাম্য রাখে, যা পরিপাকতন্ত্র ও নির্গমনতন্ত্রের জন্য ভালো ।
৫. কারা এড়িয়ে চলবেন? (Contraindications & Precautions)
মালাসন অত্যন্ত উপকারী হলেও সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ নয়। যদি নিচের সমস্যাগুলো থাকে, তাহলে এই আসন এড়িয়ে চলুন বা ডাক্তারের পরামর্শ নিন :
হাঁটুতে ইনজুরি বা ব্যথা থাকলে করবেন না। হাঁটুতে অনেক চাপ পড়ে এই আসনে।
পিঠের নিচের দিকে ইনজুরি থাকলে, বিশেষ করে স্পাইনাল ফ্লেক্সনে ব্যথা বাড়লে।
হিপ ইম্পিঞ্জমেন্ট বা কোমরের জয়েন্টে স্ট্রাকচারাল সমস্যা থাকলে।
গোড়ালির সমস্যা থাকলে, হিল মাটি থেকে উঠে গেলে সাপোর্ট নিয়ে করা যেতে পারে।
সম্প্রতি অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে (পা, হাঁটু, পিঠ বা পেলভিসে)।
গর্ভাবস্থার প্রথম ও দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে করা থেকে বিরত থাকুন ।
৬. বিগিনারদের জন্য টিপস ও মডিফিকেশন (Tips & Modifications)
প্রথমবার মালাসন করলে অনেকেরই হিল মাটি লাগে না, হাঁটুতে ব্যথা হয় বা ব্যালান্স রাখতে পারেন না। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এই সমস্যাগুলো সমাধানের উপায় আছে:
প্রপস ব্যবহার করুন (Use Props):
হিলের নিচে: রোল্ড ম্যাট, কম্বল বা ওয়েজ রাখুন। এতে গোড়ালির টেনশন কমে এবং আরামে বসা যায় ।
পোঁদের নিচে: যোগ ব্লক বা বালিশ রাখুন। এতে হাঁটুর স্ট্রেন কমে এবং হিপ ওপেনিং সহজ হয় ।
দেয়াল বা চেয়ার ধরুন: ব্যালান্স ঠিক রাখতে দরজার হাতল বা চেয়ার ধরে বসার অভ্যাস করুন ।
ওয়ার্ম-আপ জরুরি:
শুরুতে হিপ ওপেনার স্ট্রেচ করুন। যেমন: বাটারফ্লাই পোজ (Baddha Konasana) , হ্যাপি বেবি (Ananda Balasana) , বা লিজার্ড পোজ (Utthan Pristhasana) ।
ডায়নামিক স্কোয়াট করুন:
একবারে অনেকক্ষণ না থেকে, উঠা-নামা করতে থাকুন। ধীরে ধীরে জয়েন্ট অ্যাডজাস্ট হবে ।
৭. মালাসনের ভ্যারিয়েশন ও গভীরতা (Variations & Advanced Practice)
একবার আপনি বেসিক মালাসনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে, আরও কিছু ভ্যারিয়েশন ট্রাই করতে পারেন :
মালাসন I/কাঞ্চ্যসন: পা একসঙ্গে রেখে হাত পেছনে জড়িয়ে পিঠের দিকে নিয়ে যান। এটি আরও অ্যাডভান্সড ভার্সন ।
মালাসন II: হাত দিয়ে গোড়ালি ধরে রাখুন এবং কপাল মাটিতে ছোঁয়ানোর চেষ্টা করুন ।
টুইস্টেড মালাসন: এক হাত মাটিতে রেখে অন্য হাত আকাশের দিকে তুলে টুইস্ট করুন ।
এক পা বাড়িয়ে: এক পা সামনে লম্বা করে বাড়িয়ে দিন, অন্য পা স্কোয়াটে রেখে ব্যালান্স করার চেষ্টা করুন।
৮. মালাসন করার পরের আসন (Follow-up Poses)
মালাসন থেকে উঠে পরের আসনগুলো করলে শরীর আরও ভালো রেসপন্ড করে :
অধোমুখ শ্বানাসন (Downward-Facing Dog)
উত্তানাসন (Standing Forward Bend)
বালাসন (Child's Pose)
ভুজঙ্গাসন (Cobra Pose)
উপসংহার (Conclusion)
মালাসন শুধু একটি যোগাসন নয়; এটা আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব, হারিয়ে যাওয়া ন্যাচারাল মুভমেন্টের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম। ইউএস-এর মতো দেশে, যেখানে সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ করতে হয়, সেখানে এই একটি আসনই আপনাকে পিঠের ব্যথা, হজমের সমস্যা এবং মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে পারে ।
শুরুতে কষ্ট হতেই পারে। হিল মাটি না লাগতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন একটু একটু করে চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, শিশুরা যেমন সহজাতভাবে পারে, আপনিও পারবেন। কারণ এটা নতুন কিছু শেখা না, এটা অনেক পুরোনো কিছুকে মনে করার অনুশীলন ।
আজই অফিস থেকে ফিরে ৫ মিনিটের জন্য মালাসনে বসার চেষ্টা করুন। গরম জলের মগ হাতে নিয়ে বসুন, চোখ বন্ধ করুন, শ্বাস নিন। দেখবেন সপ্তাহখানেকের মধ্যেই শরীর আপনাকে "থ্যাঙ্ক ইউ" বলবে।
FAQ (প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন):
প্রশ্ন: মালাসন কি প্রতিদিন করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, একদম। এটি একটি নিরাপদ আসন এবং প্রতিদিনের রুটিনে রাখতে পারেন। তবে বেশি জোড়াজোরি করে নয়।প্রশ্ন: মালাসনে বসে জল খাওয়া কি ভালো?
উত্তর: যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালে খালি পেটে মালাসনে বসে এক গ্লাস হালকা গরম জল খাওয়া হজমের জন্য এবং শরীর ডিটক্সিফাই করার জন্য খুব ভালো ।প্রশ্ন: হাঁটুতে ব্যথা থাকলে কি মালাসন করা যাবে?
উত্তর: হাঁটুতে তীব্র ব্যথা বা ইনজুরি থাকলে এই আসন এড়িয়ে চলাই ভালো। যদি সামান্য ব্যথা থাকে, তবে হাঁটুর নিচে কম্বল রেখে বা ব্লকের ওপর বসে মডিফাই করে ট্রাই করতে পারেন ।প্রশ্ন: পিরিয়ডের সময় কি মালাসন করা যায়?
উত্তর: পিরিয়ডের ব্যথা কমাতে মালাসন খুব উপকারী। তবে যদি অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অস্বস্তি থাকে, তাহলে না করাই ভালো ।প্রশ্ন: মালাসন ও বজ্রাসনের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: মালাসনে আপনি উবু হয়ে বসেন (স্কোয়াট পজিশন), হাঁটু ভাঁজ করা থাকে। আর বজ্রাসনে আপনি হাঁটু ভাঁজ করে পায়ের ওপর ভর দিয়ে বসেন (নীচের দিকে মুখ করে বসা), পিঠ সোজা রাখা হয়।
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ