ছয় মাসেই বদলে গেল জীবন! জেনে নিন আর্পিতার সাফল্যের গল্প
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
আত্মরক্ষাই শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা: আর্পিতার গল্প, 'লেডি শেরনি'তে বদলে যাওয়ার গল্প
আমরা প্রায়ই শুনি, "মেয়েদের নিজেদের সুরক্ষা নিজেকেই শিখতে হবে।" কিন্তু সত্যিই কি সেই শিক্ষা আমরা গ্রহণ করি? সমাজের নানা অসংগতি, রাস্তার ইভ-টিজিং থেকে শুরু করে নানাবিধ অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে। কিন্তু অধিকাংশ সময় আমরা ভয় পেয়ে, সংকুচিত হয়ে চুপ করে যাই। ঠিক তেমনই একটি ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিল এক সাধারণ মেয়ে আর্পিতা।
গত ছয় মাস আগের কথা। আর্পিতা আর তার বয়ফ্রেন্ড সৌরভ বিকেলের দিকে শহরের পরিচিত একটি পার্কে বেড়াতে গিয়েছিল। পার্কের মধ্যে একটি বেঞ্চে বসে তারা গল্প করছিল। হঠাৎ করেই কিছু বখাটে ছেলে তাদের চারপাশে ঘুরঘুর করতে শুরু করল। প্রথমে চিৎকার করে অশ্লীল গান গাওয়া, তারপর আর্পিতার দিকে ইশারা করে কটূক্তি করা।
আর্পিতার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। সাহস করে সে তার বয়ফ্রেন্ড সৌরভের দিকে তাকাল। প্রত্যাশা ছিল, সে হয়তো তাদের একটু ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেবে, অথবা পাশের লোকজনের সাহায্য নেবে। কিন্তু সৌরভ কিছুক্ষণ সেখানে স্তব্ধ হয়ে থেকে মাথা নিচু করে ফেলে এবং ফিসফিস করে বলে, "ওরা সব বখাটে ছেলে। ওদের সাথে লাগলে মারামারি হবে, তারপর আমাদেরই বেগ পেতে হবে। চলো এখান থেকে চলে যাই।"
আর্পিতার মন ভেঙে গেল। সে লজ্জায়, অপমানে জ্বলে পুড়ে ছাই হলো। তার নিজের মানুষ, যার উপর তার ভরসা ছিল, সেই তাকে সঙ্গ দিল না, বরং ভীরুতার পরিচয় দিল। কোনো প্রতিবাদ না করেই তারা দুজন সেখান থেকে চলে এল। সেদিন বাসায় ফিরে আর্পিতা অনেক কেঁদেছিল। অপমানের আগুন তাকে সারাক্ষণ পোড়াত। সৌরভের সেই মুখ, যেখানে লজ্জা আর অসহায়ত্ব ছিল, তা তার চোখে ভেসে বেড়াত। সে ভাবতে থাকল, 'আমি কী এতই অসহায়? একজন মেয়ে বলে কি আমাকে চুপ করে সব সহ্য করতে হবে? যদি আমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি থাকত, তাহলে কি ওই বখাটেরা মুখ খোলার সাহস পেত?'
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই সে নতুন একটি সিদ্ধান্ত নিল। আর্পিতা ঠিক করল, সে আর কখনো অসহায় হবে না। নিজের শক্তিতে নিজেকে রক্ষা করবে। সে শুরু করল উপায় খোঁজা। অনলাইনে সার্চ করতে গিয়ে তার চোখে পড়ল "লেডি শেরনি সেলফ-ডিফেন্স অ্যাকাডেমি"-র নাম। শুধু মহিলাদের জন্য একটি অনলাইন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যা করাতের (Karate) পাশাপাশি আত্মরক্ষার কৌশল শেখায়।
আর্পিতা দ্বিধা করল না। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে তাদের পেজে যোগাযোগ করল। অ্যাকাডেমির প্রশিক্ষকের সাথে কথা বলে তার মনে আশার সঞ্চার হলো। তিনি তাকে বোঝালেন, শুধু শরীর নয়, মনটাকেও শক্ত করতে হবে। আর্পিতা ভর্তি হয়ে গেল লেডি শেরনি সেলফ-ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে।
প্রথম দিকে কষ্ট হতো। অনলাইনে ক্লাস মানে নিজের অনুশীলন নিজেকেই মনোযোগ দিয়ে করতে হতো। নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষক দেখিয়ে দিতেন মুভমেন্টগুলো, আর আর্পিতা নিজের ঘরেই অনুশীলন করত। কারাতে পাঞ্চ, কিক, ব্লক, সাথে আত্মরক্ষার কৌশল— কীভাবে হাত ছাড়ানো যায়, কীভাবে আক্রমণকারীকে মাটিতে ফেলে দেওয়া যায়, সবকিছু শিখতে থাকল সে।
দিন যেতে লাগল। আর্পিতার শরীরে যেমন শক্তি এল, তেমনই বাড়ল আত্মবিশ্বাস। তার চোখে আগুন জ্বলতে শুরু করল। ছয় মাস কঠোর পরিশ্রমের পর সে নিজেকে অনেকটাই প্রস্তুত মনে করতে লাগল। এরই মাঝে একদিন আবার সৌরভের সাথে দেখা। আর্পিতার পরিবর্তন দেখে সৌরভ অবাক। সে জানতে চাইল, "এত দিন কোথায় ছিলে? তোর মধ্যে অন্যরকম একটা আত্মবিশ্বাস দেখতে পাচ্ছি।"
আর্পিতা মুচকি হেসে বলল, "চলো আজ বিকেলে ওই একই পার্কে যাই।"
সৌরভ কিছুটা ভয়ে ভয়ে রাজি হলো। বিকেলে তারা দুজন আবার সেই একই পার্কে এল। ঠিক আগের মতোই সেখানে বসত সেই বখাটে ছেলের দল। আর্পিতাকে দেখামাত্র তাদের চোখ চকচক করে উঠল। একজন হুইসল দিল, আরেকজন মন্তব্য করল, "কিরে, আবার এলি? আগেরবার তো তোর রাজপুত্রকে নিয়ে পালিয়েছিলি!"
এবার আর আর্পিতা মাথা নিচু করে থাকল না। সে সৌরভকে এক পাশে সরিয়ে নিজেই এগিয়ে গেল তাদের দিকে। একজন বখাটে এগিয়ে এসে তার হাত ধরতে গেল। পরবর্তী কয়েক সেকেন্ড যা ঘটল, তা দেখে সবাই হতভম্ব। আর্পিতা তড়িৎগতিতে তার কব্জি ছাড়িয়ে নিল, পরক্ষণেই এক কোপে বখাটেটির পা থেকে ভারসাম্য কেড়ে নিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। অন্যরা যখন এগিয়ে আসতে গেল, আর্পিতার পোক্ত মুষ্টি এবং রণংদেহী ভঙ্গি দেখে তারা থমকে দাঁড়াল।
একজনের চোখে চোখ রেখে আর্পিতা স্পষ্ট ভাষায় বলল, "এই ছ'মাস ধরে আমি "লেডি শেরনি সেলফ-ডিফেন্স অ্যাকাডেমি"-তে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। আমি এখন আর আগের সেই অসহায় মেয়ে নই। কেউ যদি ভুলেও কোনো মেয়ের দিকে খারাপ চোখে তাকায়, তাকে এর পরিণাম ভোগ করতে হবে। এখন যদি আর কোনোদিন এদিকে ঘুরতেও দেখি, তাহলে পুলিশে দেব, তার আগে নিজের হাতে শাস্তি দেব!"
আর্পিতার কথা শেষ হতে না হতেই ওই বখাটের দল লজ্জায় মাথা নিচু করে একে অপরের দিকে তাকায়। তারা কোনোরকমে "সরি" বলে ঘটনাস্থল থেকে কেটে পড়ে।
সবকিছু দেখে সৌরভের চোখ কপালে উঠে যায়। সে আর্পিতার কাছে ছুটে এসে বলে, "আর্পিতা! কী করলে তুমি? এত শক্তি পেলে কোথায়? তুমি অসাধারণ!"
আর্পিতা গর্বিত কণ্ঠে বলল, "আমি ছ'মাস ধরে অনলাইনে ক্লাস করছি, লেডি শেরনি সেলফ-ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে। এই অ্যাকাডেমি শুধু শরীরকে শক্ত করে তোলে না, মনকেও অসম্ভব সাহস জোগায়। তাই আমি আজ এটা করতে পেরেছি। নিজের অসম্মানের জবাব নিজেই দিতে পেরেছি। সৌরভ, তুমিও কি চাও না যে, তুমি নিজেকে বদলাও? দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চাও? তাহলে আজ থেকেই তুমিও ওখানে ক্লাস শুরু করো। নিজেকে শক্তিশালী করো। শুধু অন্যের ওপর ভরসা না রেখে নিজের শক্তিকে জাগ্রত করো।"সেদিন পার্ক থেকে ফেরার পথে আর্পিতার মন ভরে গিয়েছিল। ছয় মাস আগে যে অপমানের আগুন তাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল, আজ সেই আগুনেই সে নিজেকে তৈরি করেছে শক্ত ইস্পাতের মতো। লেডি শেরনি সেলফ-ডিফেন্স অ্যাকাডেমি শুধু তাকে আত্মরক্ষার কৌশলই শেখায়নি, বরং শিখিয়েছে সাহস, আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মান রক্ষার দিশা।
আপনিও যদি আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার জের ধরে নিজেকে শক্তিশালী করতে চান, কিংবা আপনার মেয়ে, বোন বা বন্ধুকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে চান, তাহলে অপেক্ষা করবেন না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাঠ নিন। মনে রাখবেন, আত্মরক্ষাই শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা। আর এই শিক্ষা অর্জনের সেরা জায়গা হতে পারে লেডি শেরনি সেলফ-ডিফেন্স অ্যাকাডেমি, যা তৈরি করবে আপনাকে একজন সত্যিকারের 'শেরনি'।
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ